জমি কেনা একটি বড় বিনিয়োগ, তাই কোনো রকম ঝুঁকি এড়াতে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করা অত্যন্ত জরুরি। এখানে জমি কেনার আগে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই যাচাই করবেন, সেগুলোর একটি বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
১. জমির মৌলিক তথ্য যাচাই
জমির মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য প্রথমেই জমির মৌলিক তথ্যগুলো সংগ্রহ করুন এবং যাচাই করুন।
জমির তফসিল: জমির মৌজা, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং সেই দাগে জমির মোট পরিমাণ সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনে নিন। এই তথ্যগুলোই জমির পরিচয়ের মূল ভিত্তি।
২. সকল প্রকার কাগজপত্র সংগ্রহ ও পর্যালোচনা
যাঁর কাছ থেকে জমি কিনছেন, তাঁর কাছ থেকে জমিসংক্রান্ত সকল প্রকার কাগজপত্রের ফটোকপি চেয়ে নিন। এই কাগজপত্রগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা আবশ্যক:
খতিয়ানসমূহ: সি.এস. খতিয়ান, এস.এ. খতিয়ান, আর.এস. খতিয়ান এবং বি.এস. বা ঢাকা সিটি জরীপের খতিয়ানসহ সর্বশেষ হালনাগাদ খতিয়ানগুলো সংগ্রহ করুন।
বায়া দলিল (Chain of Title): জমিটি যে সকল পর্যায়ক্রমিক বেচাকেনার মাধ্যমে বর্তমান মালিকের কাছে এসেছে, সেই সকল বায়া দলিল (পূর্ববর্তী ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল) সংগ্রহ করুন। এটি জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা বুঝতে সাহায্য করবে।
নামজারি খতিয়ান: নামজারি (মিউটেশন) খতিয়ান পরীক্ষা করুন, যা মালিকানার সর্বশেষ পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
হাল সনের খাজনার দাখিলা: জমির হালনাগাদ খাজনা পরিশোধ করা আছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে হাল সনের খাজনার দাখিলা (রসিদ) চেয়ে নিন।
সংশ্লিষ্ট সকল কাগজপত্র: উপরেরগুলো ছাড়াও জমি সংক্রান্ত অন্য যেকোনো প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সংগ্রহ করুন।
৩. মালিকানা সূত্রের ধারাবাহিকতা যাচাই
জমির বর্তমান বিক্রেতা কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন, তার মালিকানা সূত্রের ধারাবাহিকতা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রয়সূত্রে মালিকানা: যদি বিক্রেতা ক্রয়সূত্রে জমির মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে তার ক্রয় দলিল বা বায়া দলিলটি রেকর্ডের সাথে মিলিয়ে বিক্রেতার মালিকানা নিশ্চিত করুন।
উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা: যদি বিক্রেতা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে সর্বশেষ জরিপের খতিয়ানের সাথে বিক্রেতা বা তাঁর পূর্বপুরুষের নামের যোগসূত্র (continuity) মিলিয়ে দেখুন। এর মাধ্যমে মালিকানার সঠিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হবে।
৪. উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির বণ্টননামা (ফরায়েজ)
যদি বিক্রেতা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হয়ে থাকেন, তবে বিক্রেতার শরিকদের সাথে সম্পত্তি ভাগাভাগির বণ্টননামা (ফরায়েজ) দেখে নেওয়া আবশ্যক।
রেজিস্টার্ড বণ্টননামা: যদি নিবন্ধিত বণ্টননামা থাকে, তবে তা ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।
আপোষমূলক বণ্টন: যদি বিক্রেতা আপোষমূলক বণ্টনের কথা বলেন যা রেজিস্ট্রি করা হয়নি, তবে ফরায়েজ (ইসলামী উত্তরাধিকার আইন) অনুযায়ী বিক্রেতা যেটুকু অংশের দাবিদার, শুধু সেটুকু কেনাই আপনার জন্য নিরাপদ হবে।
৫. মামলা ও দায়বদ্ধতা যাচাই
জমি কেনার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হোন যে জমিতে কোনো প্রকার মামলা বা দায়বদ্ধতা নেই।
মামলা: জমিটি নিয়ে বর্তমানে কোনো মামলা বিচারাধীন আছে কিনা, অথবা অতীতে কোনো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা, তা স্থানীয় ভূমি অফিস বা সংশ্লিষ্ট আদালতের মাধ্যমে জেনে নিন।
বন্ধক/দায়বদ্ধতা: ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমিটি বন্ধক বা দায়বদ্ধ অবস্থায় আছে কিনা, তা নিশ্চিত করুন। এর জন্য সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রেশন অফিসে তল্লাশি চালানো যেতে পারে।
৬. সরকারি অধিগ্রহণ বা মালিকানা যাচাই
জমিটি সরকারি খাস, পরিত্যক্ত, শত্রু সম্পত্তি কিনা, অথবা সরকার কোনো কারণে অধিগ্রহণ করেছে কিনা, তা যাচাই করা আবশ্যক।
যাচাইয়ের স্থান: এই তথ্যগুলো উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ. (ভূমি অধিগ্রহণ) শাখা থেকে জেনে নিতে পারবেন।
৭. মালিকের আইনগত সক্ষমতা
বিক্রেতা নাবালক বা অপ্রকৃতিস্থ কিনা, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।
নাবালক মালিক: যদি জমির মালিক নাবালক হন, তবে আদালতের মাধ্যমে অভিভাবক নিযুক্ত করে বিক্রয়ের অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় বিক্রয় প্রক্রিয়া আইনত বাতিল হতে পারে।
৮. সর্বশেষ নামজারি, ডিসিআর ও খাজনার দাখিলা যাচাই
জমির সর্বশেষ নামজারি পরচা, ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ) এবং হালনাগাদ খাজনার দাখিল (রসিদ) যাচাই করে দেখুন। এটি প্রমাণ করে যে, বিক্রেতার নামেই জমির রেকর্ড হালনাগাদ আছে এবং তিনি নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করছেন।
৯. নকশার সাথে সরেজমিন যাচাই ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে তল্লাশি
জমির মালিকানা স্বত্ব সঠিক পাওয়ার পর এই ধাপগুলো অনুসরণ করুন।
সরেজমিনে যাচাই: সি.এস./আর.এস./বি.এস./ঢাকা সিটি জরীপের নকশা নিয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখুন নকশা অনুযায়ী জমিটি সেই দাগের কিনা। এটি জমির প্রকৃত অবস্থান ও সীমানা বুঝতে সাহায্য করবে।
সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে তল্লাশি: সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসে তল্লাশি দিয়ে জমির সর্বশেষ বেচাকেনার তথ্য এবং অন্য কোনো দায়বদ্ধতা আছে কিনা, তা জেনে নিতে পারেন।
১০. দখল ও পথাধিকার নিশ্চিতকরণ
সবশেষে, বিক্রয়ের জন্য নির্দিষ্ট জমিটি বর্তমানে কে দখলে আছে, তা সরেজমিনে যাচাই করুন।
ভোগ দখল: জমি কেনার পর আপনি ভোগ দখলে কোনো বাধাগ্রস্ত হবেন কিনা, তা নিশ্চিত করুন।
রাস্তা বা পথাধিকার: জমিতে যাতায়াতের জন্য রাস্তা বা পথাধিকারের কোনো বাধা-নিষেধ আছে কিনা, তাও সরেজমিনে যাচাই করে নিতে হবে। এটি ভবিষ্যতে যেকোনো ঝামেলা এড়াতে সাহায্য করবে।
এই বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে জমি কিনলে আপনি একটি নিরাপদ এবং ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারবেন। আপনার যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

